মঙ্গলবার, 13 নভেম্বর 2018

স্বাধীন সাংবাদিকতা বনাম ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

Written by  মঙ্গলবার, 25 সেপ্টেম্বর 2018 02:01
ফিডব্যাক দিন
(0 votes)

সংসদের চলতি অধিবেশনে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ পাস হয়েছে। এ আইনে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারাসহ ৫টি ধারা বিলুপ্ত করা হলেও এ ধারার অনুরূপ বেশকিছু বিধান রেখেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ণ করা হয়েছে। বিষয়টি উদ্বেগের। তাই এনিয়ে সাংবাদিক, সংবাদপত্রের মালিক, আইনবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারাটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারার প্রতিচ্ছবি কিনা তা নিয়েই এখন সবার প্রশ্ন।  ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কোনো ধারা, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অনুলিখন হলেতো শংকা আর প্রশ্ন থাকেই? ভাবিছি, সত্যিই সাংবাদিকদের কন্ঠ রোধের জন্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ কিনা। অবশ্য আজকাল যেভাবে ডিজিটাল অপপ্রচারকারীর সংখ্যা বাড়ছে তা ভাবনারই বিষয়। মূহুর্তেই উৎভটসব অপপ্রচার চলে নানা ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যমে। তাতে সরকার বিব্রত। কতক পত্রপত্রিকাও এমন প্রচাওে সুখ পায় বটে! তাতে সরকার এমনি বিশেষ ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। মিথ্যা প্রচার-প্রচারনা আমাদেরও উৎকন্ঠায় ফেলে। তাই ডিজিটাল অপপ্রচারকারীদের কন্ঠরোধের প্রয়োজন আছে বৈকি!। ডিজিটাল অপপ্রচারকারীদের কন্ঠরোধ করতে গিয়ে যেন সাংবাদিকদের কন্ঠরোধ করা না হয় সেটাই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয়। সাংবাদিক সমাজে এমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সরকারকে দুর করতেই হবে। উৎকন্ঠারও কিন্তু কারন আছে। এর আগে ৫৭ ধারা নিয়ে দেশ জুড়ে সাংবাদিকরা সোচ্চার হয়ে ছিলেন। তখন বলা হয়েছিলো কোন সাংবাদিক এ ধরায় হয়রানীর শিকার হবেন না। কিন্তু আমরা কি দেখেছি? এ ধারায় সাংবাদিকগণই সবচেয়ে বেশি হয়রানীর শিকার হয়েছেন। আমরা চুন খেয়ে মুখপোড়া সাংবাদিকের দল। তাই খাঁটি দই দেখলেও ভড়কে যাই। যুগেযুগে সাংবাদপত্র আর সাংবাদিকদের কন্ঠরোধের ইতিহাস আছে। আয়নায় যখন আমরা নিজেদের মুখ দেখি, তখন ভেসে ওঠে ভিন্ন ছবি! সে ছবি উজ্জ্বল নয়, নয় দৃষ্টিনন্দন। এ ছবি অনেকটা মসিলিপ্ত, অসম্পূর্ণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কলুষিত, কুৎসিত। আমরা সব সময়ই গণতন্ত্রের কথায় উচ্চকণ্ঠ হই, স্বাধীনতার প্রশ্নে হ্যাঁ বলি, কিন্তু সংবাদপত্র কিংবা বাস্তবে সম্প্রচারমাধ্যমকে খুব বেশি মর্যাদা দিই না কখনোই। আমরা গণঅধিকারের দাবিতে সোচ্চার হই, কিন্তু গণঅধিকারের রক্ষাকবচ যে গণমাধ্যম তথা সংবাদমাধ্যম, তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কুণ্ঠাবোধ করি। সাংবাদিকদের যথার্থ মর্যাদা দেয়ার পাঠ এখনো আমরা গ্রহণ করিনি, এমনকি করার উচ্ছাও নেই বোধ করি। অগণতান্ত্রিক পর্যায় থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণে অবাধ তথ্যপ্রবাহের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হই বরাবরই। নিজেদের সঙ্কীর্ণতা ঢেকে রাখতে ভালোবাসি বলেই যারা সত্য প্রকাশে উদ্যোগী, তাদের নাস্তানাবুদ করতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব করি না, প্রকাশ্যে বদমাইশ, লম্পট বলে গালি দিতে ইতস্তত হই না। আমরা সত্যানুসন্ধানে রত সাংবাদিকদের ভালোবাসতে নাই বা পারলাম, কিন্তু তাদের জীবন ক্ষতবিক্ষত করার ক্ষেত্রে আমাদের জুড়ি নেই। এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। না হলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র বলে আর কিছুই যে থাকবে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে কোনো সময়ই সংবাদপত্রের অবাধ স্বাধীনতা ছিল না। কখনো সংবাদপত্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সেন্সরশিপ, প্রণয়ন করা হয়েছে বিভিন্ন কালাকানুন। গণমাধ্যমের কার্যালয়ে পুলিশের মারমুখী অনুপ্রবেশ, কর্মরত সাংবাদিককে চোর-ডাকাতের মতো আটক করার ঘটনা ঘটেছে অনেক। এবার নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে। সাংবাদিকগন এনিয়ে এখন  বেশ সোচ্চার। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এবং সংবাদপত্র মালিক সংগঠনও এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সংশোধন কিংবা বাতিল না হলে সংবাদিক এবং সংবাদপত্র অনৈতিক চাপের মুখে পড়বেন বৈকি! প্রশ্ন এসেই যায়, আমাদের গণমাধ্যম কি স্বাধীন? সাফ বলতে গেলে আগে কখনো ছিল না, এখনো নেই। সাংবাদিকতার ইতিহাস সেই ইংরেজ আমল থেকে আজ পর্যন্ত সংবাদপত্র কখনোই স্বাধীনতার সূর্য দেখেনি। বরাবরই আমরা সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমে হতাশার চিত্র লক্ষ্য করছি। সব সরকারই গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করতে চায়, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারও এর বাইরে নয়। বিএনপি-জামাত সরকার এমনকি তত্ববধায়ক সরকারও গনমাধ্যমের কন্ঠরোধে বেশ পারঙ্গম ছিলো। বিএনপি ক্ষমতাকালীন সময় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে সরকারের পেটোয়াবাহিনী অনুপ্রবেশ করে সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের আমলে সাংবাদিক নির্যাতন এবং হত্যার বহু ঘটনা ঘটেছে। ১/১১ সময় পত্রিকা অফিসে বিশেষ বাহিনী প্রবেশ করে আঙ্গুল তুলে কোন সংবাদ পত্রিকায় যাবে; আর কোনটা যাবে না তা বলে দেয়া হতো। এ সরকারের সময় এমনটা নয়, তবে সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকরা স্বাধীন তা বলা যাবে না। এর আগে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। মন্ত্রিসভায় এর অনুমোদন এবং গেজেট প্রকাশ করেছে। সংসদের চলতি অধিবেশনে উপস্থাপিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে এখন চলছে নানা জল্পনা কল্পনা। কেন এমন প্রশ্ন সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীমহলের? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিধানগুলোর অপপ্রয়োগের আশঙ্কা প্রবল। উল্লেখ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন প্রথম করা হয় ২০০৬ সালে। পরে ২০১৩ সালে শাস্তি বাড়িয়ে আইনটিকে আরও কঠোর করা হয়। এ আইনের ৫৭ ধারায় গত কয়েক বছরে সাংবাদিক ও সরকারি দলের প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বহু মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার পাশের নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিকগণ হয়রানী হয়েছেন সব চেয়ে বেশি। এর মধ্যে আমার কাছের মানুষ চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি মোসালীন বাবলাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে একাধিক মামলায় হয়রানি করা হয়। এটা স্পষ্ট যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এতে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। ৫৭ ধারায় অপরাধের ধরনগুলো উল্লেখ ছিল একসঙ্গে, নতুন আইনে সেগুলো বিভিন্ন ধারায় ভাগ করে দেয়া হয়েছে মাত্র। তবে অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা কিছুটা কমানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও নতুন আইনের ১৪টি ধারার অপরাধ জামিন অযোগ্য। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারায় মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে হয়রানির আশঙ্কা প্রবল, যা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করবে। যেমন, আইনটির ৩২ ধারায় ডিজিটাল অপরাধের বদলে গুপ্তচরবৃত্তির সাজার বিধান রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কোনো ধরনের গোপনীয় বা অতি গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা সংরক্ষণে সহায়তা করেন, তাহলে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ বলে গণ্য হবে।’ এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর এ অপরাধ একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা বারবার করলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এটা সাংবাদ পত্র সংশ্লিষ্ট। আর এর জন্য সাংবাদিকরা ওেয হয়রানীর শিকার হবেন তাতে কোন সন্দেহ নাই। সাংবাদিক সমাজ এবং জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী ও হয়রানিমূলক কোনো আইনই কাম্য হতে পারে না। রাষ্ট্রকে বাস্তবস্বাধীনতার পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। একটি কথা স্বরণ করিয়ে দেয়া জরুরী। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদের মাধ্যমেই উঠে আসছে। বলতে দ্বিধান নেই অধিকাংশ সাংবাদিক এবং ২/১টি ছাড়া সকল সংবাদপত্র তথা প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক্স গনমাধ্যম সরকারের পজেটিভ কর্মকান্ড তুলে ধরে সরকারকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যাপক কাজ কওে যাচ্ছেন। এদেশের সংবাদপত্র এবং সাংবাদিক সমাজ সরকারের প্রতিপক্ষ নয়। তবে কেন এমন কঠোর আইন করছে সরকার। তাতে সাংবাদিক সমাজ সরকারের বিপক্ষে বিগড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। যা সরকারের জন্য মোটেও শুভ হবে না। ডিজিটাল আইনে আপত্তি ও বিতর্কিত ধারাগুলো অপরিবর্তিত রেখে সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা খুবই উদ্বেগজনক। একদিকে বিলের ৮, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারার বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্বেগ ও মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। যা তাদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে বিতর্কিত ৩২ ধারায় ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-১৯২৩ অনুসরণের সুপারিশ করার দৃষ্টান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাব্যঞ্জক। নিবর্তনমূলক এই আইন সংযোজনের উদ্দেশ্য নিয়ে সাংবাদিকদেও প্রশ্ন তুলাই স্বাভাবিক। এখানে ষ্পষ্ট যে, বিতর্কিত ৫৭ ধারার বিষয়গুলো এ আইনেও চারটি ধারায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। আইনের ১৪টি ধারার অপরাধ হবে অজামিনযোগ্য। বিচার হবে ট্রাইব্যুনালে, ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করা হবে। প্রস্তাবিত আইনের ৩২ ধারার অপপ্রয়োগের ফলে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী দুর্নীতি মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত আইনি অধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হবে। ফলে এই ধরনের অপরাধের আরও বিস্তার ঘটবে। এ ছাড়াও অনুসন্ধানীমূলক সাংবাদিকতা ও যে কোনো ধরনের গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে। এটি আইনে পরিণত হলে তা সংবিধানের মূল চেতনা, বিশেষ করে মুক্ত চিন্তা, বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করবে। ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি কল্যাণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন নিশ্চিতের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে প্রস্তাবিত আইনটি তাতে বাধা সৃষ্টি করবে। গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ভূমিকা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। গণমাধ্যমসহ সকল নাগরিকের সমস্ত ধরনের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সরকারকে সহযোগিতা প্রদান এবং বাধাহীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারে তার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। এ জন্য জনমত যাচাই করা যেতে পারে। নীতিমালার নামে মানুষের বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ যেমন নিন্দনীয়, তেমনি স্বাধীনতার নামে সম্প্রচারমাধ্যম এবং পত্রপত্রিকাগুলোর দ্বারা এর অপব্যবহার করে সমাজে টেনশন ও গোলযোগ সৃষ্টিও কাম্য নয়। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ গণতন্ত্রহরণেরই নামান্তর। তা করা মোটেও সুখকর নয়। বিশ্বে কোনো দেশে কোনো সময় তা সুফল বয়ে আনেনি। সরকারের কোন আইন বা নীতিমালার বিরুদ্ধে আমি নাই। যে কোনো কিছুর জন্য নীতিমালা থাকা ভালো। সমস্যাটা হলো অপব্যবহারের। আর আমাদের দেশে এ সমস্যাটা প্রকট। আমরা সময় সুযোগ পেলেই যে কোনো কিছুর অপব্যবহার করি। ধরে নিই কোনো এক কামার ধারালো কোনো অস্ত্র (যেমন দা) বানাল নিত্যপ্রয়োজন সারতে। সে দা দিয়ে কুপিয়ে মানুষ হত্যা করা হলো। তাহলে কর্মটা কেমন হবে? যে অস্ত্র মানুষের কল্যাণে বানানো হলো তা ভালো কাজে ব্যবহার না করে মানুষের গলা কেটে দেয়া হলো। ঠিক তেমনি যে নীতিমালা বাকস্বাধীনতার সৌন্দর্য রক্ষায় প্রণীত হবে, সে নীতিমালা যদি 'নিয়ন্ত্রণের' রূপ নিয়ে সেই আকাঙ্খিত স্বাধীনতাকেই টুঁটি চেপে ধরে, তা ঠেকাবে কে? প্রশ্ন হলো, সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুমোদিত নীতিমালাটি যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে প্রণীত হয়েছে কি? সরকার সংশ্লিষ্টদের ভাষায় নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকগণ হয়রানি হবেন না। যদি তাই হয়, তাহলে ভালো কথা।
প্রকৃতপক্ষে সব সরকারই গণমাধ্যম নিন্ত্রয়ণ করতে চায়। সেই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে যে শুরু আজও তার শেষ নেই। তবে পুরোপুরি তা পারে না কোনো সরকারই। তা হয় কেবল সাময়িক। একটা বিষয় বরাবই আমরা দেখে আসছি, আধুনিক বিশ্বে মোটামুটি সব দেশেই সরকার এবং তার দোসর বাহিনী গণমাধ্যমের ওপর চড়াও হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক শক্তি বলে পরিচিত সরকারগুলো যখন ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চায়, তখন গণমাধ্যমের দুর্দিন নেমে আসে। আর বলতে গেলে আমাদের দেশে সংবাদপত্র প্রকাশের আগেই নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়। সংবাদপত্র প্রকাশের জন্য প্রকাশক ও মুদ্রণকারীকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ঘোষণা দিতে হয়। নিয়মিত বা সাময়িক সংবাদপত্র প্রকাশের জন্য পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হয়। এটি সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশে কতখানি আনুকূল্য তৈরি করতে পারে তা সহজেই বোধগম্য। সরকারি অফিসগুলোর পেছনে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে অনেক সংবাদপত্রের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। সংবাদপত্র প্রকাশের অনুমতি লাভের পর নিয়ন্ত্রণরেখার বাইরে পদচারণা করা সম্ভব হয় না সংবাদপত্রের জন্য। সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধের জন্যও অবলম্বিত হয় বিভিন্ন প্রক্রিয়া এবং আইনগত ও মৌখিক সেন্সরশিপ। কখনো কখনো এ সেন্সরশিপ রাতের গভীরে 'অ্যাডভাইস' আকারে ফোনের মাধ্যমে এসে আবির্ভূত হয়। সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ নিজেও কখনো সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে, মুক্তচিন্তা প্রকাশের ক্ষেত্রেও ভিন্ন পরিবেশ তৈরি করতে পারে। সম্প্রতি সৃজনশীল লেখকদের দৈনিক সংবাদপত্রে মুক্ত হাতে কলাম লিখতে অনুপ্রাণিত দেখা যাচ্ছে। চিন্তাজগতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি কলাম লেখক হিসেবে তাদের ভূমিকা যদি মুখ্য হয়ে ওঠে, সংবাদপত্রের আদর্শ, দর্শন ও চিন্তা যদি তাদের ওপর অযাচিত প্রভাব বিস্তার করতে উদ্যোগ নেয়, তাহলে একদিকে সৃজনশীল সাহিত্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে, অন্যদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মুক্ত-আকাশের পরিসর সীমিত হয়ে উঠবে। আমি এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এ মুহূর্তে ডিজিটাল নিরাপিত্তা আইনের নামে কঠোর কোন আইন প্রনয়ন সমচিন নয়। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর এ দেশের গণমাধ্যম এক নতুন চরিত্র নিয়ে গড়ে উঠতে শুরু করে। তখন থেকেই বহু নিয়ন্ত্রণমূলক আইন-কানুন বাতিল শুরু হয়। এ কথা সত্য যে, ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখলেও ব্যক্তিমালিকানায় নতুন চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। বর্তমান সময়ে বেতার এবং টেলিভিশনের জন্য এ সুযোগ আরো বিস্তৃত, অনেকটা অবারিত। বর্তমানে এ দেশে ব্যক্তিমালিকানায় প্রায় দুই ডজন টিভি চ্যানেল, ডর্জনেরও বেশি এফএম রেডিও এবং বেশ কয়েকটি কমিউনিটি রেডিও চালু রয়েছে। এসব গণমাধ্যম কম-বেশি এখন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে মুক্ত এবং স্বাধীন চরিত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তবে ডিজিটাল নিরাপিত্তা আইন গণমাধ্যমের সুন্দর এ পথচলা রুদ্ধ করবে বইকি! এ মূহুর্তে সংবাদপত্র তথা সাংবাদিকটের চটানো কতটা সঠিক হবে তা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। ভুল পথে হাঁটা সরকারের জন্য বিপজ্জনক হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, বাড়ছে এর অপপ্রয়োগও। তাই সাইবার অপরাধ বাড়ছে। সরকার বলছে, এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বা দমনের জন্য এ আইন করা হয়েছে; সংবাদপত্র বা বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়। মত প্রকাশে বাধা যেন না থাকে সেটা নিশ্চিত করা জরুরী। সাংবাদিক প্রতিনিধি, শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে আইনটিতে যথাযথ পরিবর্তন আনা হোক। যেসব বিধান অপপ্রয়োগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ থেকে সরকার সেই সব বিধান সত্তার অপসারণ করবে এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।
                                                                                       মীর আব্দুল আলীম,
                                                                          সাংবাদিক,  কলামিষ্ট, গবেষক।

২৫-০৯-২০১৮

25-09-2018

 

পড়া হয়েছে 14 বার

আপনার মতামত জানান...

আপনার মতামত জানানোর জন্য ধন্যবাদ

প্রধান সম্পাদক : আতিয়ার পারভেজ || সম্পাদক ও প্রকাশক : মনোয়ারা জাহান || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: শাহীন ইসলাম সাঈদ।
বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ২৫, স্যার ইকবাল রোড, পিকচার প্যালেস মোড়, গোল্ডেন কিং ভবন, খুলনা।
সম্পাদক কর্তৃক দেশ বাংলা প্রিন্টার্স, ৫৮, সিমেট্রি রোড, খুলনা হতে মুদ্রিত ও ১০০, খানজাহান আলী রোড থেকে প্রকাশিত।
যোগাযোগঃ সম্পাদক : ০১৭৫৫-২২৪৪০০, বার্তা কক্ষ : ০১৭৮৭-০৫৫৫৫৫, বিজ্ঞাপন : ০১৭৫৫-১১১৮৮৮
ইমেইল : newsamarekush@gmail.com || ওয়েব: amarekush.com