রবিবার, 21 এপ্রিল 2019

স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও বটিয়াঘাটার সেবাদাসী বীরাঙ্গনা খেতাব পায়নি

Written by  শুক্রবার, 22 মার্চ 2019 01:03
ফিডব্যাক দিন
(0 votes)

  এনায়েত আলী বিশ্বাস : ১৯৭১ সালের ১৯ মে বুধবার জৈষ্ঠ্য মাসের সকাল। পাকহানাদার ও রাজাকার বহিনী নেমেছে ফুলতলা মঠ এলাকায়। তারা সংবাদ পেয়েছে দেশ ত্যাগের  উদ্দেশ্যে বাদামতলা বাজারে বহুলোক জড়ো হয়েছে। হানাদার বাহিনী গানবোট যোগে কাজিবাচা নদীর ফুলতলা মঠে এসে নামে। তারা  ফুলতলা গ্রামে প্রবেশ করে নির্যাতন শুরু করে। মুহুর্তের মধ্যে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। হানাদার এবং রাজাকার বহিনী দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে ফুলতলা এবং দেবীতলা গ্রামের পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে হাটতে থাকে। সারা গ্রামে আতংকের ছাপ বিরাজ করছে। যে যার মতো পরিবার পরিজন নিয়ে ছুটছে পালাতে। কেউ দৌড়ে আবার কেউ বা নৌকা যোগে। সকলের উদ্দেশ্য গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে বাদামতলা বাজার। সেখানে যেয়ে সবাই মিলে এক যোগে পালাবে ভারতের উদ্দেশ্যে। হানাদার বাহিনী দেবীতলা গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া চরার খালের পাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছে। সামনে যাকে পাচ্ছে তাকে নির্দয় ভাবে পিটিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করছে। ঠিক তখনই চরার খালের ভিতর একটি নৌকায় বৃদ্ধ মাদার চন্দ্র ঢালী অন্যান্যদের উঠিয়ে পালাবার চেষ্টায় ব্যস্ত রয়েছেন। তখন ষড়সী  সুন্দরী গৃহবধু সেবাদাসী বিশ্বাস দ্রুত দৌঁড়ে নৌকায় ওঠার চেষ্টা করলে এক খান সেনা তার দিকে রাইফেল তাক করে নৌকায় উঠতে বাঁধা দেয়। তারা সেবাদাসী এবং তার সঙ্গে থাকা স্বামী দেবীতলা গ্রামের প্রফুল্ল বিশ্বাসকে ধরে ফেলে। নৌকার উপরে মাদার চন্দ্র ঢালীর মাথায় গুলি করলে সে খালের ভিতর পড়ে যায়। সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে। পরে সেবাদাসী ও তার স্বামী প্রফুল্ল বিশ্বাসকে পাশের একটি ফাঁকা ভিটার মধ্যে নিয়ে যায়। ভিটার চারিদিকে লতাপাতায় ঘেরা বাগান। সুযোগ বুঝে স্বামী প্রফুল্ল পিছন থেকে পালিয়ে গেলেও সেবাদাসীর হাত তখনও ওরা ধরে রেখেছে।  সেবাদসী লজ্জা ভরা ছলছল চোখে জানায়, একজন খান সেনা ওই ফাঁকা ভিটায় বাগানের মধ্যে তার মুখ চেপে ধরে সতিত্ব ছিনিয়ে নেয়। অন্যান্যরা একটু দুরে দাঁড়িয়ে ছিল। পরে আমাকে ছেড়ে দেয়। এ দৃশ্য দেখে বাগানের মধ্যে পালিয়ে থাকা বিমল মন্ডল দৌড়ে পালায়। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে একই গ্রামের যুবক নগেন্দ্র নাথ মন্ডল বিলের মধ্যে বাগানের আড়ালে বসে পত্যক্ষ করেন। নগেন্দ্র নাথ  মন্ডল ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তখন তার বয়স ২১/২২ বছর। বিলের ভিতর এক বাগানের আড়ালে লুকিয়ে খান সেনাদের তান্ডবের সকল দৃশ্য তিনি দেখেন। তিনি বলেন সেদিনের গুলিতে ফুলতলা গ্রামের নীল কমল মন্ডল, বসুরাবাদ গ্রামের ধীরেন্দ্র নাথ তরফদার, বয়ারভাঙ্গা গ্রামের বলরাম মন্ডল, দেবীতলা গ্রামের নিত্যানন্দ মন্ডল, মাদার চন্দ্র ঢালী, উপেন্দ্র নাথ বিশ্বাস, কুঞ্জলাল মন্ডল, নির্মল মন্ডল, পার্বতী চরন মন্ডল, মনোহর মন্ডল, হৃদয়নাথ মন্ডলসহ আরও অজ্ঞাত নামা দু’জন নিহত হয়। এ সময় গুলিতে আহত হয় দেবীতলা গ্রামের প্রেমলতা মন্ডল স্বামী মৃত কালিপদ মন্ডল, টুকু রাণী রায় স্বামী কার্তিক রায় ও কার্তিক রায়ের কন্যা তৃপ্তি রাণী রায়। অন্ত:সত্তা টুকু রাণী ভয়ে এ ঘটনার মাত্র ১০ দিন পর বাচ্চা প্রসব করেন। পরে হানাদার এবং রাজাকার বাহিনী বাদামতলা বাজারে প্রবেশ করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। তাদের গুলিতে সেখানে বহুলোক নিহত হয়।   বিধবা সেবাদাসী আজও তার স্মৃতি বহন করে  চলেছেন। তিনি বলেন, গ্রামের বহু মানুষের তিরস্কার নিন্দা সহ্য করে আজও বেঁচে আছি। তবে বারবার চেষ্টা করেও আজও বিরঙ্গনা হতে পারিনি। বহুবার বটিয়াঘাটা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডে আবেদন করেছি। কোন ফল মেলেনি। জীবন বেলার শেষ প্রান্তে এসে সেবাদাসীর একান্ত ইচ্ছা বিরাঙ্গনা খেতাব নিয়ে যেন পৃথিবী ছাড়তে পারে। মৃত্যুর পর যেন সম্মানের সাথে শেষকৃত্ত সম্পন্ন হয়।

২২-০৩-২০১৯

22-03-2019

 

পড়া হয়েছে 11 বার

আপনার মতামত জানান...

আপনার মতামত জানানোর জন্য ধন্যবাদ

প্রধান সম্পাদক : আতিয়ার পারভেজ || সম্পাদক ও প্রকাশক : মনোয়ারা জাহান || ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মো: শাহীন ইসলাম সাঈদ।
বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ২৫, স্যার ইকবাল রোড, পিকচার প্যালেস মোড়, গোল্ডেন কিং ভবন, খুলনা।
সম্পাদক কর্তৃক দেশ বাংলা প্রিন্টার্স, ৫৮, সিমেট্রি রোড, খুলনা হতে মুদ্রিত ও ১০০, খানজাহান আলী রোড থেকে প্রকাশিত।
যোগাযোগঃ সম্পাদক : ০১৭৫৫-২২৪৪০০, বার্তা কক্ষ : ০১৭৮৭-০৫৫৫৫৫, বিজ্ঞাপন : ০১৭৫৫-১১১৮৮৮
ইমেইল : newsamarekush@gmail.com || ওয়েব: amarekush.com